ঢাকার রাজনীতিতে আব্বাস-খোকার দ্বৈরথ

ঢাকার রাজনীতিতে আব্বাস-খোকার দ্বৈরথ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে দুটি বলয় কয়েক দশক ধরে চলে আসছে। একপর্যায়ে এই বলয় ছড়িয়ে পড়ে কেন্দ্রেও। একটি বলয়ের নেতৃত্ব দিতেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। আর আরেকটি বলয়ের নেতৃত্ব দিতেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা।

মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার এই বৈরিতার কথা কারো অজানা নয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল এই দ্বন্দ্ব। দুটি বলয়ের কোনো পক্ষ কেউ কাউকে ছাড় দেয়ার নয়। এই বিরোধ মিটমাট করতে বিএনপির হাইকমান্ডকে বেশ কয়েকবার গলদঘর্ম হতে হয়েছে। কিন্তু বিরোধ মেটে নি। যদিও এই বিরোধের কথা স্বীকার করতেন না খোকা-আব্বাস কেউ-ই।

মির্জা আব্বাস একসময় ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন, পরে সেই স্থানে আসেন খোকা। এরপর আবারও মির্জা আব্বাসকে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়। ঢাকার এক সময়ের মেয়র ছিলেন মির্জা আব্বাস, পরে খোকাও মেয়র হন। মির্জা আব্বাস বিএননি ক্ষমতায় থাকাকালে একাধিকবার মন্ত্রী হন। খোকাও ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিত্ব পান।

মির্জা আব্বাস যখন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসটিব ঠিক একই সময়ে একই পদে ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। আব্বাস এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে রয়েছেন। খোকা নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সাদেক হোসেন খোকার নামও আলোচনায় ছিল।

খোকা রাজনীতির কঠিন পথ চলেছেন দৃঢ় পদে। ঢাকা মহানগর বিএনপিতে আলাদা একটি বলয় তৈরি করেছিলেন তিনি। বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাসের বিপরীতে দীর্ঘসময় ঢাকার রাজনীতির মাঠ কাঁপিয়েছেন তিনি।

খোকা বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে মার খেয়েছেন বারবার। ঢাকায় বহু রাস্তায় তার রক্তের দাগ রয়েছে। একবার তো গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল খোকার। আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে ঝাঝড়া হয়ে যায় তার বুক। গুলি লাগে তার মুখমন্ডলেও।

এ নিয়ে মির্জা আব্বাসের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই দুনেতা দ্বন্দ্ব নিরসনে হিমশিম খেতে হয় বিএনপির হাইকমান্ডকে।

তবে রাজনৈতিক ‘চিরশত্রু’ সাদেক হোসেন খোকার অবস্থা সংকটাপন্ন শুনে ভেঙে পড়েন মির্জা আব্বাস। কয়েক যুগের শত্রুতা ভুলে খোকার পাশে দাঁড়ান তিনি। তার সুস্থতা কামনায় একটি আবেগঘন খোলা চিঠি লিখেন। সেটি নিজের ফেসবুক ওয়ালেও দেন মির্জা আব্বাস। এই চিঠি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে বিএনপির নিযুত নেতাকর্মীদের। খোলা চিঠিতে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, সুস্থ হয়ে ফিরে এসো খোকা, ফিরো এসো। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।

চিঠিতে অসুস্থ খোকার প্রতি সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক বিরোধের কথাও উল্লেখ করেন মির্জা আব্বাস। আবার একসঙ্গে পথচলার আশাও করেন।

মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ‘প্রিয় খোকা, এই মাত্র আমি খবর পেলাম যে, তোমার শরীর খুব খারাপ। তুমি হাসপাতালে শয্যাশায়ী। জানার পর থেকে আমার মানসিক অবস্থা যে কতটা খারাপ, এই কথাটুকু কারও সঙ্গে শেয়ার করব, সেই মানুষটা পর্যন্ত আমার নেই। তুমি-আমি একসঙ্গে রাজনীতি করেছি, অনেক স্মৃতি আমার চোখের সামনে এই মুহূর্তে ভাসছে।’

স্বার্থান্বেষীরা তাদের মধ্যে বিরোধ জিইয়ে রেখেছে উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ‘তোমার আর আমার দীর্ঘ এই পথচলায় কেউ কেউ তাদের ব্যক্তি স্বার্থে তোমার আর আমার মাঝে একটা দূরত্ব তৈরি করে রেখেছিল। তবে তুমি আর আমি কেউই সেই দূরত্বে রয়েছি বলে আমি কখনোই মনে করিনি।’

খোকার দু:সময়ে পাশে না থাকতে পারার আক্ষেপ প্রকাশ করে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ‘আমি জানি না, তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কি না? আমার এই লিখাটি তোমার চোখে পড়বে কি না বা তুমি দেখবে কি না, তাও আমি জানি না। তবে বিশ্বাস কর, তোমার শারীরিক অসুস্থতার কথা জানবার পর থেকেই বুকের ভেতরটা কেন যেন ভেঙে আসছে।’

খোকার সুস্থতার কামনা করে আব্বাস লিখেন, ‘আমি বার বার অশ্রুসিক্ত হচ্ছি। মহান আল্লাহ তালার কাছে দুহাত তুলে তোমার জন্য এই বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করছি- তিনি অবশ্যই তোমাকে সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরে আনবেন।’

খোকাকে লেখা আব্বাসের চিঠি শেষ হয় এভাবে, ‘তুমি আর আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, বুকে বুক মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে কাজ করে যাব। না হয় সেই আগের মতোই স্বার্থপর কোনো মানুষদের জন্য আব্বাস আর খোকা বাইরে বাইরে দূরত্বের সেই অভিনয়টা করে যাবে, আর ভেতরে থাকবে দুজনের প্রতি দুজনের অন্তর নিংড়ানো ভালোবাসা।’

‘আল্লাহ তোমার সুস্থতা দান করুক। তুমে ফিরে এসো খোকা, তুমি ফিরে এসো। আমি অপেক্ষায় থাকব’-যোগ করেন আব্বাস।

খোকা-আব্বাস দ্বন্দ্বের অবসান হলো একজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

আজ বাংলাদেশ সময় বেলা ১টা ৫০ মিনিটে নিউইয়র্কে মারা গেছেন খোকা। বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন ধরে কিডনির ক্যান্সারে ভুগছিলেন।

শায়রুল কবির খান বলেন, সাদেক হোসেন খোকা নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে স্লোসেন ক্যাটারিং ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সাদেক হোসেন খোকার লাশ দেশে আনা হবে কিনা, এটি জানতে চাইলে শায়রুল কবির বলেন, এ ব্যাপারে দলীয় নেতৃবৃন্দ আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

আপনার মতামত লিখুন :
error0



এই বিভাগের আরো খবর